মৃত স্বামীর সম্পত্তি স্ত্রী কতটুকু পাবেন, তা নির্ভর করে তারা কোন ধর্মীয় আইনের অনুসারী ছিলেন তার ওপর। বাংলাদেশে প্রধানত মুসলিম উত্তরাধিকার আইন (শরিয়াহ) এবং হিন্দু উত্তরাধিকার আইন (দায়ভাগ) প্রযোজ্য।
এখানে উভয় প্রধান ধর্মীয় আইন অনুযায়ী মৃত স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রীর হিস্যা কতটুকু, তা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী (শরিয়াহ)
মুসলিম আইনে স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তির একজন নির্দিষ্ট অংশীদার (Sharer) হন। তবে তার হিস্যা পরিবর্তন হয় সন্তান আছে কি নেই তার ওপর ভিত্তি করে।
পরিস্থিতি | স্ত্রীর হিস্যা (অংশ) | উদাহরণ
১. স্বামীর যদি কোনো সন্তান বা পুত্রের সন্তান (পোতা/নাতী) থাকে | আট ভাগের এক ভাগ (১/৮ অংশ) | স্বামীর মোট সম্পত্তির ১/৮ অংশ পাবেন স্ত্রী। বাকি ৭/৮ অংশ অন্যান্য ওয়ারিশদের মধ্যে (যেমন—সন্তান, মা-বাবা) বন্টন হবে।
২. স্বামীর যদি কোনো সন্তান বা পুত্রের সন্তান না থাকে | চার ভাগের এক ভাগ (১/৪ অংশ) | স্বামীর মোট সম্পত্তির ১/৪ অংশ পাবেন স্ত্রী। বাকি ৩/৪ অংশ অন্যান্য ওয়ারিশদের মধ্যে (যেমন—পিতা-মাতা, ভাই-বোন) বন্টন হবে। |
গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য:
একাধিক স্ত্রী: যদি মৃত স্বামীর একাধিক স্ত্রী থাকেন, তবে তারা সবাই মিলেই উপরে উল্লিখিত অংশটি (১/৮ বা ১/৪) পাবেন। অর্থাৎ, তাদের হিস্যা সমানভাবে ভাগ হয়ে যাবে।
যেমন: যদি দুজন স্ত্রী থাকে এবং সন্তান থাকে, তবে উভয়েই (১/৮ ÷ ২) = ১/১৬ অংশ করে পাবেন।
দেনমোহর (Mahr): মৃত স্বামীর সম্পত্তি বণ্টনের আগে স্ত্রীর অনাদায়ী দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে। দেনমোহর একটি ঋণ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এটি সম্পত্তির বণ্টনের আগে স্বামীর মোট সম্পত্তি থেকে বাদ দেওয়া হয়।
হিন্দু উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী (দায়ভাগ)
বাংলাদেশে হিন্দু উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে হিন্দু বিবাহিত নারী অধিকার আইন, ১৯৩৭ এবং হিন্দু উত্তরাধিকার আইন (দায়ভাগ) প্রযোজ্য হয়।
১. স্বামীর স্ব-অর্জিত সম্পত্তি (Self-acquired Property): স্ত্রী তার মৃত স্বামীর স্ব-অর্জিত সম্পত্তির ওপর আজীবন ভোগদখল বা সীমিত মালিকানা (Limited Estate) অর্জন করেন। তিনি সম্পত্তি ভোগ করতে পারতেন, কিন্তু বিক্রি বা হস্তান্তর করতে পারতেন না।
২. স্বামীর পৈতৃক সম্পত্তি (Ancestral Property): হিন্দু আইনে স্ত্রী সরাসরি পৈতৃক সম্পত্তির অংশ পেতেন না।
সাম্প্রতিক পরিবর্তন:
বর্তমান যুগে আদালতের বিভিন্ন রায় এবং সময়ের পরিবর্তনের কারণে হিন্দু নারীর সম্পত্তির অধিকার নিয়ে আলোচনা চলছে। অনেক ক্ষেত্রে, স্ত্রী পূর্ণ মালিকানা দাবি করতে পারেন, তবে আইনি জটিলতা এড়াতে একজন আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য।
সাধারণ আইন: পারিবারিক সুরক্ষা আইন, ২০০৫
বাংলাদেশ সরকারের পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ অনুযায়ী, স্ত্রী স্বামীর মৃত্যুর পরেও সেই বাড়িতে থাকার বা বসবাস করার অধিকার রাখেন, যদি না তাকে আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উচ্ছেদ করা হয়।
উপসংহার:
মৃত স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রীর অংশ নির্ধারণের আগে অবশ্যই ধর্ম, সন্তান আছে কি নেই এবং দেনমোহরের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। সঠিক হিস্যা জানার জন্য একজন অভিজ্ঞ উত্তরাধিকার বা ভূমি আইন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য। আমাদের যুক্ত হতে পেজটিতে ফলো দিন।
অ্যাডভোকেট মো. নাজমুল হাসান
আইনজীবি ও লেখক।
সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ